সখীপুরে ১ মাসে পাঁচ খুন

চলমান হালচাল জাতীয় প্রচ্ছদ সম্পাদকীয় সারাদেশ

মুহাম্মদুল্লাহ

টাঙ্গাইলের সখীপুরে গত এক–দেড় মাসে অন্ততঃ পাঁচ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রতিনিয়ত খুনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় শঙ্কায় সখীপুরের মানুষ। খুন হওয়া মানুষদের মধ্যে বৃদ্ধ যেমন আছেন, তেমন আছেন ছোট শিশুও। মুখোমুখি আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সখীপুরের লোকজন নিজেদের অনিরাপদ বোধ করার কথা জানাচ্ছেন।

দৈনিক ইত্তেফাকের সখীপুর উপজেলা প্রতিনিধি মামুন হায়দার গতকাল উদ্ধার হওয়া মৃত সামিয়ার ছবিসহ এ বিষয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলে শাহনাজ আরিফিন নামে একজন মন্তব্য করেন, এখনই এদের (খুনিদের) কঠোরভাবে দমন করতে হবে। নয়তো খুনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে। তাছাড়া আমরা যে গর্ব করে বলতাম– সখীপুরের মানুষ শান্তিপ্রিয়, তা আর বলা যাবে না।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের সখীপুর উপজেলা প্রতিনিধি এম এইচ সজল নিহত সামিয়ার হত্যাকারীদের বিচার চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলে আরিফুল ইসলাম আরিফ নামে একজন লিখেন–সখীপুর এখন অপরাধীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল।

দৈনিক আজকের পত্রিকার সখীপুর উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম সামী সামিয়ার লাশ উদ্ধারের খবর ফেসবুকে পোস্ট করলে সিকদার রাসেল নামে একজন মন্তব্য করেন, গত কয়েক মাসে সখীপুরের মতো আর কোনো জায়গায় মনে হয় এত অপরাধ সংঘটিত হয়নি।প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর অনুরোধ।

এভাবে অনেকেই সখীপুর অনিরাপদ হয়ে যাওয়ার কথা লিখছেন এবং বলছেন। তারা প্রশাসনকে আরো তৎপর হওয়ার দাবি জানান।

২০ জুলাই ব্যবসায়ী চাচা-ভাতিজা খুন

গত ২০ জুলাই বৃহস্পতিবার সখীপুরের কাকড়াজান ইউনিয়নের বাঘেরবাড়ি এলাকায় দুই ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে হত্যা করে দূর্বত্তরা। একই দিন ভোরে স্থানীয়রা লাশ দুটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। নিহতরা হলেন, সখীপুর উপজেলার কাকড়াজান ইউনিয়নের বাঘেরবাড়ি গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে শাহজালাল (৩৫) ও নবু মিয়ার ছেলে মজনু মিয়া (৪৫)।

পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায় , শাহজালাল বাঘেরবাড়ি বাংলা বাজারে মুদি দোকান ও বিকাশের ব্যবসা করতো। রাতে দোকান বন্ধ করে ওই দুই ব্যবসায়ী বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা হয়। পরে তারা আর বাড়িতে ফিরেনি। মধ্যরাতে তারা একটি নির্জন স্থানে পৌছালে, দূর্বত্তরা তাদের মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। সকালে স্থানীয়রা লাশ দুটি দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেয়। লাশ দুটির পাশে তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি পড়ে ছিল।

এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোস্তফা মিয়া (২০) ও আল আমিন (২৭) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। জিজ্ঞাসাবাদে তাঁদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে র‍্যাব বলছে, ঋণের টাকা পরিশোধ করতেই এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার সখীপুর ও ঢাকার মোহাম্মদপুরে অভিযান চালিয়ে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

১৩ আগস্ট কিশোরীর লাশ উদ্ধার

গত ১৩ আগস্ট রোব্বার রাত আটটার দিকে সখীপুর উপজেলার কাঁকড়াজান ইউনিয়নের ছোটচওনা গ্রামের একটি পোল্ট্রি খামারের পাশ থেকে আলমিনা আক্তার নামে এক শিশোরীর লাশ উদ্ধার করা হয়। আলমিনা ওই ইউনিয়নের ছোটওচনা গ্রামের হারুন মার্কেট এলাকার আলহাজ মিয়ার মেয়ে। ওই কিশোরী মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল বলে তাঁর পিতা জানান।

কিশোরীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১২ আগস্ট শনিবার রাত ১০টার দিকে আলমিনা তার দাদার ঘরের একটি ঘরে ঘুমাতে যায়। রবিবার (১৩ আগস্ট) সকালে তাকে আর সেখানে পাওয়া যায়নি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর আলমিনাকে না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। পরে রাত ৮টার দিকে খবর আসে স্থানীয় একটি পোল্ট্রি ফার্মের পাশে আলমিনার লাশ পাওয়া গেছে। খবর পেয়ে সখীপুর থানা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

কিশোরীর বাবা আলহাজ মিয়া জানান, তার মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। মেয়ের মৃত্যুতে কারও বিরুদ্ধে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই।

তবে কিশোরী আলমিনার দাদা আবদুল আজিজের দাবি তাকে কেউ হত্যা করেছে। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আলমিনা কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল। তবে চিকিৎসা করানো হয়েছে, এখন সে সম্পূর্ণ সুস্থ। আমার নাতনির খুনিকে ধইরা দিতে হবো, খুনির উপযুক্ত বিচার করতে হবো। খুন কইরা যারা এখানে ফালাইয়া রাখছে আমি তাগো উপযুক্ত বিচার চাই। এ ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

৪ সেপ্টেম্বর বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার

গত ৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে সখীপুরের হতেয়া উলিয়ারচালা গ্রাম মে নিখোঁজের একদিন পর বাড়ির পাশে পরিত্যক্ত জমি থেকে আরফান আলী (৬০) নামের এক বৃদ্ধের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই এলাকার মৃত কুরবান আলীর ছেলে।

নিহতের পরিবার সূত্রে জানা যায়, আরফান আলী রবিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বাড়ি থেকে বের হলে রাতে আর বাড়ি ফিরে আসেনি। তার পরিবার বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখোজির পর সোমবার দুপুরে পরিত্যক্ত জমিতে তার লাশ দেখে পুলিশকে খবর দেয়। পরে পুলিশ এসে লাশটি উদ্ধার করে। এ ঘটনায়ও এখন পর্যন্ত কেউ  গ্রেফতার হয়নি।

৮ সেপ্টেম্বর তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার

শুক্রবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টায় বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে বনের ভেতর একটি ড্রেন থেকে সামিয়া (৯) নামে তৃতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করে সখীপুর থানা পুলিশ। সামিয়া উপজেলার দাড়িয়াপুর গ্রামের রঞ্জু মিয়ার মেয়ে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর বাবা রঞ্জু মিয়া সখীপুর থানায় মামলা করেন।

পুলিশ ও সামিয়ার পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বুধবার সকাল ৭টায় ওই ছাত্রী বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথের কাছে প্রাইভেট পড়তে যায়। প্রাইভেট পড়া শেষ হলে সহপাঠীদের সঙ্গে বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে বের হয়।পথে একটি দোকানে সহপাঠীরা কেনাকাটা করতে দাঁড়ালে সে একাই বাড়ির দিকে রওয়ানা হয়। এদিকে বাড়ি ফিরতে বিলম্ব হওয়ায় মা রুপা বেগম শিক্ষককে ফোন দিয়ে জানতে পারেন তার মেয়ে অনেক আগেই চলে গেছে।

পরে মা মেয়েকে খুঁজতে বের হলে বাড়ির কাছাকাছি একটি স্থানে মেয়ের ব্যবহৃত জুতা পড়ে থাকতে দেখেন।
এর কিছুক্ষণ পর তার মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে একটি অডিওবার্তা আসে।

অডিওবার্তায় বলা হয়, ‘আসসালামু আলাইকুম। আপনার মেয়ে ভালো আছে। টাঙ্গাইলে আছে, আজকের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা দিলে মেয়ে পাবেন। বিষয়টি পুলিশ ও এলাকার কাউকে জানাবেন না। জানালে আপনার মেয়ের ক্ষতি হবে। এরপরে শুক্রবার দুপুরে সামিয়ার লাশ উদ্ধার করা হয়।