সৌদি আরবে হাজার হাজার কর্মী বেকার

আন্তর্জাতিক জাতীয় প্রচ্ছদ

মনির হোসেন

দালালের প্রলোভনে লাখ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব যাওয়ার পর অসংখ্য শ্রমিক কাজ না পেয়ে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। সাথে রয়েছে আবার আকামার জটিলতা। আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে ইতোমধ্যে বহু শ্রমিককে অবৈধ হয়ে পড়তে হয়েছে। এরপরও এখনো সৌদি আরবে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক যাচ্ছে। পাড়ি জমানো প্রতারিত শ্রমিকরা বলছেন, ‘ফ্রি ভিসার’ নামে কেউ যাতে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব আসার চেষ্টা না করে। তাহলে তাদের (প্রতারিত শ্রমিক) মতোই করুণ অবস্থার মধ্যে পড়তে হবে।

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে এই বিষয়টি কঠোরভাবে মনিটরিং করতে না পারলে সৌদি আরবে প্রতারিত শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বাড়তেই থাকবে। এতে দেশে রেমিট্যান্স আসার পরিবর্তে ভিসা কেনাসহ নানা খাতে বাংলাদেশ থেকেই চলে যাবে বিপুল পরিমাণ টাকা।
সৌদি আরব থেকে প্রবাসী বাংলাদেশীরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব এসে বহু শ্রমিক এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এসব শ্রমিককে মোটা অঙ্কের বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দালালরা আনলেও এখন মিলছে না কাজ। যার কারণে তাদের প্রতিটি দিন কাটছে অর্থকষ্টের মধ্যে। শুধু তাই নয়, আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে অনেকের হচ্ছে জেল জরিমানাও। এসব ভেবে দেশে থাকা তাদের পরিবারের সদস্যদের থাকতে হচ্ছে টেনশনের মধ্যে।

খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় সৌদি আরব গিয়ে দিশেহারা অনেক প্রবাসী বাংলাদেশী। কাজের সন্ধানে ঘুরছেন পথে পথে। রাস্তার ধারে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখলেই হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। চাকরি খুঁজতে খুঁজতে আকামার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কেউ কেউ হয়ে পড়ছেন অবৈধ। আবার যারা কাজ পাচ্ছেন তারা বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য বেতন থেকে। বেকারত্ব ঘোচাতে নি¤œমানের কাজ জোটালেও সেখানেও দেখা দিচ্ছে বিপত্তি। ভিসার পেশার সাথে কাজের মিল না থাকলে আর্থিক জরিমানাসহ জেলে যেতে হচ্ছে তাদেরকে।

সৌদি আরবে ফ্রি ভিসায় গিয়ে কাজে যোগদান করার পরও ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশী। পরে বাধ্য হয়ে ওই সব প্রবাসীরা জীবন বাঁচাতে ফুটপাথে দোকান বসিয়ে জীবিকা নির্বাহের কাজ করছেন। যদিও তার ভিসার সাথে পেশার মিল নেই।

এমনই একজন প্রবাসী যুবক ঢাকার একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সৌদি আরব প্রতিনিধিকে বলেন, ‘ফ্রি ভিসায় আইন্যা আমারে কাজ দিছে। কিন্তু পাঁচ মাস ধইর‌্যা ওহনে আমি বেতন পাই না। তাইলে আমি কি করুম। কাজ কাম পাই না। তাই বাধ্য হইয়্যা এই নি¤œমানের পেশাই শুরু করছি।’ আরেক প্রবাসী বাংলাদেশী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আপনারা দালালের খপ্পরে পইড়্যা অরিজিন্যাল ভিসা ছাড়া আয়য়েনই না। যদি কোম্পানিতে পান, কম টাকা হইলে তাইলে আইয়্যেন।’ আরেক প্রবাসী বলেন, ‘ফ্রি ভিসায় আমাদের মতো কেউ আইসেন না। কেউ বাড়ি বেইচ্যা, কেউ গাড়ি বেইচ্যা। আপনারা আসবেন সর্বস্বান্ত হইয়্যা যাইবেন।’

প্রতারিত শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সৌদি আসাদের মধ্যে অনেকে রয়েছেন উচ্চ শিক্ষিত। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আত্মীয়দের প্রলোভনে সৌদি আসলেও পরে মিলছে না তাদের সন্ধান।

ক্ষুব্ধ এক প্রবাসী বলেন, ‘এরকম লোভ আমাগো দেখাইছে যে, সৌদির আরামকো কোম্পানিতে ফোরম্যানের কাজ করবি। বেতন পাবি এক লাখ ৭০-৮০ হাজার টাকা। এখন আইস্যা ভাই রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হইতেছে। কোনো কাজ বাজ নাই। তিন মাসের আকামা দিয়্যা রাস্তার মধ্যে হাঁটাইতেছে। থাকার কোনো জায়গা নাই। খাবারের কষ্ট তো হইতেছেই।’
এসব জটিল সমস্যা নিয়ে সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী সম্প্রতি দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে বৈঠক করেছেন বলে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।

অভিবাসন বিশ্লেষকরা বলছেন, ঢাকার জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো বহির্গমন ছাড়পত্র দেয়ার আগে যদি শ্রমিকদের কোম্পানিতে কাজ এবং বেতনের নিশ্চয়তা যাচাই বাছাই করে দিয়ে থাকেন, তাহলে প্রতারিত শ্রমিকের সংখ্যা কমে আসবে। নতুবা লাখ লাখ টাকা খরচ করে এসব শ্রমিকরা বিদেশে পাড়ি জমিয়ে প্রতিনিয়ত মানবেতর জীবন ও জেল জরিমানা দিতে থাকবে। এখনই সরকারের এসব ব্যাপারে আরো কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার প্রয়োজন। তারা বলছেন, শুধু বেশি শ্রমিক বিদেশে পাঠিয়ে বাহবা না কুড়িয়ে ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ কর্মী পাঠানোর দিকেই বেশি জোর দিতে হবে বলে মনে করছেন তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক মো: শহিদুল আলমের সাথে এ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

উল্লেখ্য বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব। দেশটিতে বর্তমানে ২৫ লাখের মতো বাংলাদেশী অবস্থান করছে। এর মধ্যে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ শ্রমিক যাচ্ছে তার প্রায় অর্ধেক শ্রমিকই যাচ্ছে দেশটিতে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৪৩ হাজার ৪২৬ জন শ্রমিক বহির্গমন ছাড়পত্র নিয়ে বিশ্ব্রে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ ৬৫ হাজার ৭৩৩ জন গিয়েছে সৌদি আরবে। যদিও তুলনামূলকভাবে দিন দিন দেশটিতে শ্রমিক যাওয়া কমছে। এমনটি দেখা যাচ্ছে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে।

দৈনিক নয়া দিগন্ত