মালয়েশিয়ায় নেওয়ার প্রলোভন, মিয়ানমারে নিয়ে মুক্তিপণের জন্য নির্যাতন

প্রচ্ছদ সারাদেশ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মা সাইন প্রিন্টিং প্রেসে বড় ভাই আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে কাজ করতেন জহিরুল ইসলাম। গত মার্চে দোকানের পাশ থেকে নিখোঁজ হন তিনি। এক মাস পর পরিবার জানতে পারেন, জহিরুল মিয়ানমারে বন্দি। মুক্তিপণ হিসাবে চাওয়া হয় ছয় লাখ টাকা। হতবিহ্বল পরিবার অনেক কষ্টে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা ইসলামী ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে পাঠায়। এরপর বিকাশে আরও টাকা পাঠান। তবুও পাচারকারীচক্রের মন গলেনি। জহিরুলকে জীবিত ফেরত চাইলে দিতে বলা হয় আরও টাকা। একপর্যায়ে নগদ টাকা নিতে এসে এপ্রিলে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন চক্রের সদস্য আবুল। পরে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানায় মামলা করেন জহিরুলের বড় ভাই আবুল কালাম আজাদ। 

মামলা ও গ্রেফতারের খবরে জহিরুলের ওপর নেমে আসে অমানবিক নির্যাতন। জানানো হয়, জহিরুল আর জীবিত ফিরবে না। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বেরিয়ে আসে, শুধু জহিরুল নন, মালয়েশিয়ায় উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলা থেকে ১৯ যুবককে মিয়ানমারে আটকে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারীচক্রের বাংলাদেশের হোতা মো. ইসমাইল ও তার দুই সহযোগীকে আটক করা হয়। এরপর আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য পায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

র‌্যাব জানায়, মিয়ানমারের এক নাগরিকের যোগসাজশে এ চক্র গড়ে তোলেন ইসমাইল। চক্রের সদস্যদের খপ্পরে পড়ে ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নত জীবনযাপনের আশায় মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছা পোষণ করেন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার ২২ যুবক। তাদের কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ট্রলারে মিয়ানমার নেওয়া হয়। সেখানে তাদের নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে একটি চক্র। মিয়ানমার থেকে ট্রলারে পাচারকালে ১৯ যুবককে মিয়ানমার কোস্টগার্ড আটক করে। বাকি তিন যুবক অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পৌঁছে যায়। মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর পাচারকারী চক্রের নির্যাতনে ভুক্তভোগী যুবক জহিরুল ইসলাম মারা যান। বাকি দুই যুবক অবৈধভাবে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন।

রাজধানীর কাওরান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে শনিবার দুপুরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, শুক্রবার রাতে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীতে অভিযান চালিয়ে এ চক্রের বাংলাদেশি তিন সদস্যকে আটক করা হয়। তারা হলেন চক্রের হোতা মো. ইসমাইল ও তার সহযোগী জসিম এবং মো. এলাহী। তাদের মধ্যে ইসমাইল ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ওই সময় মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের নাগরিক রশিদুল ও জামালের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। পরে ইসমাইল দেশে ফিরে এসে রশিদুল ও জামালের যোগসাজশে ১০-১২ জনের একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্র গড়ে তোলেন।

র‌্যাব জানায়, চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন এলাকার তরুণ ও যুবকদের কোনো প্রকার অর্থ ও পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়া সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া পৌঁছানোর আশ্বাস দেন। মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পর কাজ করে ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবেÑএমন প্রলোভন দেখিয়ে যুবক-বেকারদের পাচার করে।